রেস্তোরাঁর টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে, সেদিকে মন নেই কারও, যে যার মোবাইলে গেম খেলতে ব্যস্ত। অবস্থা যদি এমন হয় তবে গেম আসক্তির আশঙ্কা থেকে যায়। গেমিং অ্যাডিকশন অনলাইন, মোবাইল বা ভিডিও গেমে আসক্তিকে মনঃস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

১৩ বছরের আহনাফ। ক্লাস সেভেনে পড়ে। পড়ালেখায় ভালোই ছিল। একদিন তার মামা তাকে একটি স্মার্টফোন উপহার দিল। এরপর থেকে শুরু হলো তার গেম খেলা। বেশির ভাগই অনলাইন গেম। ধীরে ধীরে গেম খেলার পরিসর বাড়তে থাকল। অনলাইনে দেশিবিদেশি নানা গেমারের (গেম খেলোয়াড়) সঙ্গে পরিচয়-এয়ারফোনে কথা বলা শুরু হলো। ফলাফল, ক্লাস এইটে ওঠার সময় চার বিষয়ে ফেল! এটা ২০১৯সালের ঘটনা। সারা দিন গেম নিয়ে ব্যস্ত স্মার্ট শিশুর-কিশোররা মা-বাবার সঙ্গে কোনো দাওয়াতে যেতে চায় না, বন্ধুদের সঙ্গে মেশে না, গল্পের বই পড়ে না। ক্রিকেট বা অন্য কোনো খেলাও খেলে না। ডিজিটাল পর্দার গেম ছাড়া তার আর কোনো কিছুতে আগ্রহ নেই। বাসা-বাড়িতে কয়েক মুহূর্তের জন্য ওয়াইফাই বন্ধ থাকলে তার উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়। অস্থিরতা শুরু করে। আহনাফের মতো এমন বৈশিষ্ট্যের কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে মা-বাবারা সংকটে থাকেন। সর্বশেষ গত সপ্তাহে মোবাইল গেম নিয়ে দু’দল তরুণের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বিয়ানীবাজার পৌরশহরের নয়াগ্রাম রোডে সৃষ্ট এ সংঘর্ষে দুবাগ এলাকার এক টিনেজকে মারধর করা হয়।


এক সমীক্ষা অনুযায়ী, নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে ভিডিও গেম খেলে এমন অধিকাংশই হচ্ছে অল্প বয়সী শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণী। পাবজি! প্লেয়ার্স আননোন ব্যাটেল গ্রাউন্ড! বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন গেম। মোবাইল ফোন এবং কম্পিউটার দুটোতেই খেলা যায় এই গেম। তবে বিয়ানীবাজার তথা সারাদেশে পাবজির কম্পিউটার ভার্সনের থেকে মোবাইল ভার্সনটিই বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন এ গেম খেলছেন ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ! অনলাইনভিত্তিক এই ভিডিও গেমটিতে একসাথে ১০০জন মানুষ একটি পরিত্যক্ত দ্বীপে থাকে। খেলোয়াড়কে প্রথমে প্যারাসুটের মাধ্যমে সেখানে নামিয়ে দেয়া হয়। সেখানে একে অপরকে হত্যা করে টিকে থাকতে হয়। ভয়ংকর সব গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করে খতম করতে হয় একে একে সবাইকে। এক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতারও আশ্রয় নেয়া হয়। চলে হত্যার ষড়যন্ত্র-পরিকল্পনা। দিন কিংবা রাতের বেশীরভাগ সময় এই গেম খেলাকালে সংশ্লিষ্টরা জোরে চিৎকার, চেচামেচি এমনকি গালিগালাজও করে থাকে। অনলাইনে বন্ধুরা পরস্পরে কথাবার্তা বলে এ হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে শলা-পরামর্শ করে। কয় পয়েন্ট পাওয়া গেল, কতজন নিহত হল, বাকিদেরকে কীভাবে হত্যা করা যায়-এসবই এ ভয়ংকর গেমের বিষয়। হত্যাযজ্ঞ শেষে যে ব্যক্তি বা যে গ্রæপ বেঁচে থাকে, তারাই হয় বিজয়ী। সব মিলিয়ে মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় কিশোর-তরুণেরা ‘পাবজি’তে এতটাই মগ্ন থাকছে যে, বাস্তব পৃথিবী ভুলে তারা এক বিপজ্জনক নেশায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। ভিডিও গেমসের এ নিধনযজ্ঞ অনেক বাস্তব অনুভব হচ্ছে তাদের কাছে। মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা এবং হাতের নাগালের মধ্যে থাকা ইন্টারনেটের কারণেই এই গেমটির জনপ্র্রিয়তা আকাশচুম্বী। বর্তমানে এই গেমে অত্যধিক আসক্ত হয়ে পড়ছে শিশু থেকে শুরু করে কিশোর এবং তরুণরাও।

পূর্ব মুড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খালেদ আহমদ বলেন, গ্রামের শিশুরা খেলাধুলার কিছুটা সুযোগ পেলেও শহরের শিশুদের সে সুযোগ কম। বড়দের মতো শিশুদের মধ্যেও ভর করছে শহুরে যান্ত্রিকতা। ফলে তারা খেলাধুলার আনন্দ খুঁজে ফিরছে মাউসের বাটন টিপে, কম্পিউটারের পর্দায় গেমস খেলে, কিংবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। অনেক সময় তাদের এ আকর্ষণটা চলে যাচ্ছে আসক্তির পর্যায়ে। ধীরে ধীরে তারা র্নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে কম্পিউটার-মোবাইল-ট্যাব গেমসের ওপর। এজন্য প্রথমেই বলা যায়, ভিডিও গেমস আমাদের শিশু-কিশোরদের প্রকৃত শৈশব-কৈশোর কেড়ে নিচ্ছে।



মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ভিত্তিক বিনোদনের ভয়াবহ পরিণতির চিত্র পাওয়া গেছে বেসরকারি এক জরিপে। এতে দেখা যায়, বিয়ানীবাজারের স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৩৭ ভাগ পর্নোগ্রাফি দেখে।



এ ধরনের আসক্তির বিষয়ে শিক্ষাবিদ আলী আহমদ মনে করেন, এসব গেমে আসক্তির কারণে কিশোররা পারিবারিক, সামাজিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। কেবল শারীরিক ক্ষতির কারণই নয় এই ফ্রি ফায়ার গেমটি। সেই সঙ্গে মানসিক রোগের কারণও হতে পারে তা।

বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আবু ইসহাক আজাদ বলেন, যেকোনো আসক্তিই খারাপ। এই অনলাইন গেমে যদি আসক্তি তৈরির উপাদান থাকে, এটি যদি আসক্তি তৈরি করে তাহলে তাতে আচরণগত সমস্যা তৈরি হয়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। প্রাত্যহিক কাজে মনোযোগ কমে যায়। আচরণগত সমস্যা তৈরি হলে এ ধরনের গেম নিয়ে ভাবনার বিষয় রয়েছে।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আরিফ হাসান জানান, এই গেমটি অতিরিক্ত খেলার কারণে চোখের সমস্যাও হতে পারে। আর সেই সঙ্গে দেখা দেয় ঘুমের ঘাটতিও। কম্পিউটার কিংবা মোবাইলের স্ক্রিনে বেশি সময় ধরে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের ক্ষতি হতে পারে।

Leave a comment